ডেস্ক রিপোর্ট: 3 April 2026 , 5:43:32 129 বার পঠিতপ্রিন্ট সংস্করণ
ধরুন, সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলেন আপনার মোবাইলে ওয়াইফাই বা মোবাইল ডেটা—কোনোটিই কাজ করছে না। ফেসবুক, ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপ, ব্যাংকিং—সব স্তব্ধ! হ্যাঁ, বর্তমান বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এমন একটি “ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট” বা বিপর্যয়ের আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়া এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ইন্টারনেট শাটডাউনের এই খবরটি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। এর পেছনের মূল কারণগুলো হলো:
সমুদ্রের তলদেশের ফাইবার ক্যাবল: এটি সম্পূর্ণ সত্য এবং বৈজ্ঞানিক বাস্তব যে, সারা বিশ্বের প্রায় ৯৫ থেকে ৯৭ শতাংশ ইন্টারনেট ডেটা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে নয়, বরং সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে যাওয়া ফাইবার-অপ্টিক সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে আদান-প্রদান হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের চরম উত্তেজনা: যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যকার চলমান উত্তেজনা এখন এক বিপজ্জনক পর্যায়ে। হরমুজ প্রণালী এবং লোহিত সাগরের মতো জায়গাগুলো এই ক্যাবলগুলোর জন্য একটি বড় “চোক পয়েন্ট” বা দুর্বল স্থান।
ইরানের হুমকি—গুজব নাকি বাস্তব? সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে ইরান এই ক্যাবলগুলো কেটে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। যদিও ইরানের শীর্ষ পর্যায় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে “৯৫% ইন্টারনেট ধ্বংস” করার কথা সরাসরি বলা হয়নি, তবে সমর বিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন থিঙ্ক-ট্যাংক সতর্ক করছে যে, যুদ্ধ বাঁধলে ইরান বা তাদের সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো (যেমন হুতি বিদ্রোহীরা) চাইলেই হরমুজ প্রণালী বা লোহিত সাগর দিয়ে যাওয়া ক্যাবলগুলো বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে। এই রুটটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে এশিয়া, ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যে ভয়াবহ ইন্টারনেট ধীরগতি বা ব্ল্যাকআউট দেখা দিতে পারে।
সৈন্য মোতায়েন: যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে এই অঞ্চলে তাদের সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে এবং বিভিন্ন কৌশলগত অবস্থান নিচ্ছে, যা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাত্রাকে আরও বাস্তব ও আশঙ্কাজনক করে তুলেছে।
ইন্টারনেট ছাড়া যোগাযোগের উপায় (অফলাইন মেসেজিং অ্যাপ):
যুদ্ধের কারণে, ক্যাবল কাটা পড়লে বা যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে মানুষ “মেশ নেটওয়ার্কিং” (Mesh Networking) প্রযুক্তি ব্যবহার করে এমন অ্যাপের দিকে ঝুঁকছে। এই অ্যাপগুলো ইন্টারনেট বা সেলুলার নেটওয়ার্ক ছাড়াই শুধুমাত্র ব্লুটুথ এবং ওয়াইফাই ডাইরেক্ট ব্যবহার করে কাছাকাছি থাকা ডিভাইসগুলোর মধ্যে মেসেজ আদান-প্রদান করতে পারে।
সতর্কতামূলক প্রস্তুতি হিসেবে আপনিও যে অ্যাপগুলো ফোনে ইনস্টল করে রাখতে পারেন:
Bridgefy (ব্রিজফাই): ব্লুটুথ ব্যবহার করে ১০০ মিটার বা ৩৩০ ফুট দূরত্বের মধ্যে থাকা মানুষের সাথে চ্যাট করা যায়। ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে থাকে।
Briar (ব্রায়ার): এটি চরম নিরাপত্তার জন্য তৈরি। ইন্টারনেট না থাকলে এটি ব্লুটুথ বা ওয়াইফাইয়ের মাধ্যমে কাজ করে। সাংবাদিক এবং অ্যাক্টিভিস্টরা জরুরি মুহূর্তে এটি বেশি ব্যবহার করেন, কারণ এর মেসেজগুলো এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপ্টেড।
FireChat (ফায়ারচ্যাট): এটিও মেশ নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে কাজ করে। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, যত বেশি মানুষ এই অ্যাপ ব্যবহার করবে, এর নেটওয়ার্ক রেঞ্জ তত বাড়বে। একজনের ফোন থেকে আরেকজনের ফোনে সিগন্যাল লাফিয়ে লাফিয়ে বহুদূর পর্যন্ত মেসেজ পৌঁছে দিতে পারে।
Vojer (ভোজার): আইওএস বা আইফোন ব্যবহারকারীদের জন্য এটি একটি দারুণ অফলাইন ওয়াকি-টকি এবং মেসেজিং অ্যাপ, যা কোনো ইন্টারনেট ছাড়াই ভয়েস নোট ও টেক্সট পাঠাতে পারে।
পুরো পৃথিবীর ইন্টারনেট একেবারে এক সেকেন্ডে শূন্য হয়ে যাওয়াটা প্রযুক্তিগতভাবে বেশ কঠিন, কারণ ইন্টারনেটের রুট একটি বিশাল জালের মতো কাজ করে। তবে সমুদ্রের তলদেশের গুরুত্বপূর্ণ ক্যাবল কাটা পড়লে গ্লোবাল শেয়ার বাজার, ব্যাংকিং খাত এবং সাধারণ যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসবে। তাই গুজব থেকে সতর্ক থাকার পাশাপাশি, চরম মুহূর্তের জন্য বিকল্প যোগাযোগের মাধ্যমগুলো সম্পর্কে জেনে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ!












