ডা.শিশির আহমেদ 14 April 2026 , 10:52:14 65 বার পঠিতপ্রিন্ট সংস্করণ
প্রকৃতির মহীরুহ বনাম রাজনীতির পরজীবী: এক ‘বট ফলের’ উপাখ্যান বটের ছায়া মানেই যেন এক অদ্ভুত প্রশান্তি, এক চিলতে শীতল আশ্রয়। কাঠফাটা রোদে ক্লান্ত পথিক থেকে শুরু করে ডানা ঝাপটানো পাখি—সবার কাছেই বটগাছ এক পরম নির্ভরতার নাম। কিন্তু এই বটেরও যে দুটো ভিন্ন রূপ থাকতে পারে, তা কি আমরা কখনো ভেবে দেখেছি? একটি বট প্রকৃতির বুকে নিঃস্বার্থভাবে প্রাণ বিলায়, আর অন্য ‘বট’ রাজনীতির চোরাগলি ধরে চুষে নেয় জীবনীশক্তি! সদ্য রচিত এক রম্য কাব্যের অন্তর্নিহিত ভাবনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হলো আমাদের আজকের এই বিশেষ উপসম্পাদকীয়।
বটের ফলগুলো দেখতে ভারী মিষ্টি। কাঁচা অবস্থায় গাঢ় সবুজ, আর পাকলে টুকটুকে লাল। জোড়ায় জোড়ায় পাতার আড়ালে উঁকি দেওয়া এই ফলের বৈজ্ঞানিক নাম ‘সাইকোনিয়াম’। মজার ব্যাপার হলো, এই ফল মানুষের পেটে জায়গা না পেলেও, পাখিদের কাছে এটি রীতিমতো রাজকীয় ভোজ!
কাক, শালিক, বাদুড় থেকে শুরু করে নাম না জানা কত শত পাখি রোজ ভিড় জমায় বটের শাখায়। স্বাদে খুব একটা আহামরি না হলেও পাখিদের পেট ভরাতে আর প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় এর জুড়ি মেলা ভার। পাখিরাও অকৃতজ্ঞ নয়; বটের ফল খেয়ে দূর-দূরান্তে উড়ে গিয়ে তারা ছড়িয়ে দেয় বীজ, গেয়ে যায় বটের বংশ বিস্তারের জয়গান। গ্রীষ্ম, বর্ষা কিংবা শীত—প্রকৃতির এই চক্রে বট যেন এক অমল, চিরন্তন দাতা।
বাঙালির শেকড় ও সাহিত্যের ‘বটতলা’ বটগাছ শুধু বাস্তুতন্ত্রেরই নয়, আমাদের সাহিত্য আর সংস্কৃতিরও এক বিশাল অংশ। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায় বটের যে মায়াময় ছায়ার কথা ফুটে উঠেছে, তা যেন বাংলার প্রতিটি গ্রামের চিরচেনা রূপ। ‘বটতলা’ মানেই তো কেবল একটি গাছ নয়; এটি লোককথা, গানের আসর, বাউলিয়ানা আর গ্রামীণ পঞ্চায়েতের এক জীবন্ত ক্যানভাস। শত বছর ধরে নীরবে দাঁড়িয়ে বটগাছ যেন হয়ে ওঠে কালের নীরব সাক্ষী, এক বিশাল মহীরুহ।
রাজনীতির ‘বট দল’: পরজীবীর আরেক নাম, এতক্ষণ বটের যে রূপের কথা বলা হলো, তা স্নিগ্ধ এবং জীবনের সমার্থক। কিন্তু গল্পের মুদ্রার উল্টো পিঠে রয়েছে এক অন্য বটের উপাখ্যান—যার বিচরণ রাজনীতির ময়দানে। উদ্ভিদবিজ্ঞানে বটগাছের একটি অদ্ভুত স্বভাব আছে; এরা অনেক সময় অন্য গাছের ডালে বীজ হিসেবে জন্ম নেয়, এরপর শেকড় নামিয়ে ধীরে ধীরে সেই আশ্রয়দাতা গাছটিকেই শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলে।
রাজনীতির মাঠে গজিয়ে ওঠা এই ‘বট দল’ ঠিক সেই পরজীবী স্বভাবটিই বুকে ধারণ করে। এরা নামে বট হলেও কাজে সম্পূর্ণ ভিন্ন। অন্ধকার রথে চেপে অন্যের আশ্রয়ে এরা বেড়ে ওঠে, আর সুযোগ পেলেই সেই আশ্রয়দাতাকে ধ্বংস করে দেয়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের রক্তরাঙা ইতিহাস ঘাঁটলে এই রাজনৈতিক পরজীবীদের আসল চেহারা আর ধ্বংসলীলার ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দুঃখের বিষয় হলো, যুগের পর যুগ পেরিয়ে গেলেও সেই বিষাক্ত বটের ছায়া আজও কোথাও কোথাও সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিস্তারের অপেক্ষায় থাকে।
জীবন বনাম ধ্বংস: আমাদের বেছে নেওয়ার পালা:
কবির ভাষায়, আজ আমাদের এই দুই রূপের বটকেই গভীরভাবে চিনতে হবে। প্রকৃতির বট মহান, সে আমাদের প্রাণের আপন সাথী, বাস্তুতন্ত্রের রক্ষক। সে আমাদের ছায়া দেয়, পাখিদের খাবার দেয়।
অন্যদিকে, মানুষের ছদ্মবেশে থাকা ‘বট দল’ কেবলই সমাজের জন্য লজ্জার। সমাজ বা রাষ্ট্র গঠনে আমাদের যদি কোনো বটের আশ্রয় নিতেই হয়, তবে তা যেন সৎ এবং শেকড়সন্ধানী হয়। প্রকৃতির মতো পরোপকারী বটই আমাদের কাম্য, অপরের প্রাণ শুষে নেওয়া পরজীবী ‘বট দল’ নয়। ছায়া দেওয়ার বটগাছ টিকে থাকুক শতবর্ষ, আর ধ্বংসের বট উপড়ে যাক শেকড়সুদ্ধ—এটাই হোক আগামীর প্রত্যাশা!















