ডেস্ক রিপোর্ট: 13 April 2026 , 1:00:49 106 বার পঠিতপ্রিন্ট সংস্করণ
অনুপম আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ওয়াশিংটনের আরব সেন্টারে আয়োজিত এক সম্মেলনে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র পরাজিত হচ্ছে। এর ফলে বিশ্ব স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়ছে এবং আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিচ্ছে।
ওয়াশিংটন ডিসিতে আরব সেন্টারের ১১তম বার্ষিক সম্মেলনে বিশেষজ্ঞরা টানা পাঁচ ঘণ্টা ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে মধ্যপ্রাচ্য নীতি, ইরান যুদ্ধ এবং এর ফলে মধ্যবর্তী নির্বাচন, গণতান্ত্রিক মানদণ্ড, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের ওপর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেন। উদ্বোধনী অধিবেশনটি পরিচালনা করেন সেন্টারের প্রেসিডেন্ট খলিল জাহশান। অনুষ্ঠানে লেখক ও মানবাধিকার আইনজীবী নূরা এরাকাতকে সম্মানিত করা হয়।
পরাজয়ের পথে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল
উদ্বোধনী অধিবেশনে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক জন মেয়ারশাইমার বলেন, যুদ্ধের বর্তমান গতিপ্রকৃতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য একটি পরাজয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এই পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়েছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ইসরায়েল যেকোনো সময় পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে। কারণ ইসরায়েলিরা ইরানকে তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি মনে করে। যদি তারা বিশ্বাস করে যে তেহরান পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করেছে, তবে তারা চূড়ান্ত শক্তি প্রয়োগ করতে পারে। তিনি আরও যোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রে ‘ইসরায়েলি লবি’র শক্তিশালী প্রভাবের কারণে ওয়াশিংটন সম্ভবত তাদের এই কাজ থেকে বিরত রাখবে না।
মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলি স্বার্থের অগ্রাধিকার
মেয়ারশাইমার বলেন, অতীতে তেল প্রধান চালিকাশক্তি থাকলেও বর্তমানে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্কের কারণে মধ্যপ্রাচ্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যুক্তি দেন যে, ইসরায়েল ওয়াশিংটনের কাছ থেকে নজিরবিহীন এবং শর্তহীন সমর্থন পায়। এমনকি যখন ইসরায়েলি স্বার্থ যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তখনও মার্কিন নীতি ইসরায়েলের অনুকূলেই থাকে।
তিনি ইসরায়েলের তিনটি প্রধান কৌশলগত লক্ষ্যের কথা উল্লেখ করেন:
সীমানা বিস্তার: অধিকৃত পশ্চিম তীর, গাজা, দক্ষিণ লেবাননের লিটানি নদী পর্যন্ত, সিরিয়ার দক্ষিণাংশ এবং সম্ভাব্য সিনাই উপদ্বীপ পর্যন্ত দখল করা।
জাতিগত নিধন: তাদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল বিশেষ করে গাজা ও পশ্চিম তীর থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করা।
প্রতিবেশীদের দুর্বল রাখা: জর্ডান বা লেবাননের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের অনুগত রাখা এবং সিরিয়া, ইরান বা তুরস্কের মতো শক্তিশালী দেশগুলোকে ধ্বংস বা অস্থিতিশীল করে তোলা।
মেয়ারশাইমার বলেন, গাজা যুদ্ধের মূল লক্ষ্য ছিল প্রথম দুটি উদ্দেশ্য হাসিল করা। ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধে যখন উচ্ছেদ পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হয়, তখন এটি বোমা হামলা ও অনাহার নীতির মাধ্যমে গণহত্যায় রূপ নেয়। এ সময় তিনি মার্কিন উদারপন্থীদের নীরবতায় বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং বলেন, মার্কিন নেতারা ভবিষ্যতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বিচারের মতো জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে পারেন।
ইরান সংকট ও ট্রাম্পের সীমাবদ্ধতা
ইরান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইসরায়েল দেশটিকে সিরিয়ার মতো ধ্বংস করতে চায় অথবা সেখানে একটি পুতুল সরকার বসাতে চায়। তিনি দাবি করেন, ইসরায়েলের মাধ্যমে বিভ্রান্ত হয়ে ওয়াশিংটন এই যুদ্ধে জড়িয়েছে। এটি এখন একটি দীর্ঘমেয়াদী ‘ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধে’ (War of Attrition) পরিণত হয়েছে যা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে জেতা সম্ভব নয়। মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা, যুদ্ধবিমান হারানো এবং উন্নত গোলাবারুদের ঘাটতি এর প্রমাণ।
তিনি আরও বলেন, হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ইরান এখন বিশ্ব বাণিজ্যে বিপর্যয় ঘটাতে পারে, যা বিশ্বজুড়ে সার সরবরাহ ও খাদ্য উৎপাদনে প্রভাব ফেলে দুর্ভিক্ষ ডেকে আনতে পারে। এই সীমাবদ্ধতার কারণে ট্রাম্প চাইলেও যুদ্ধ আর বাড়াতে পারবেন না এবং পরাজয় স্বীকার করাই হয়তো তার একমাত্র পথ হবে। ট্রাম্পের ইরানি সভ্যতা ধ্বংস করার হুমকিকে মেয়ারশাইমার ‘গণহত্যামূলক’ বলে অভিহিত করেন।
নীতি ও জনমতের ব্যবধান
সম্মেলনের অন্যান্য অধিবেশনে ট্রিটা পারসি, লারা ফ্রিডম্যান এবং মার্ক লিঞ্চের মতো বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন। ট্রিটা পারসি বলেন, ইরানকে দুর্বল হিসেবে চিত্রিত করে ইসরায়েল ট্রাম্পকে যুদ্ধে প্ররোচিত করেছে। লারা ফ্রিডম্যান উল্লেখ করেন যে, গাজা ইস্যুতে ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকান—উভয় প্রশাসনের নীতিই প্রায় একই।
মানবাধিকার আইনজীবী নূরা এরাকাত সতর্ক করেন যে, বর্তমান নীতিগুলো আন্তর্জাতিক আইনকে ধ্বংস করছে। তিনি ফিলিস্তিনিদের অধিকার হরণ করার প্রচেষ্টাকে বিশ্বব্যবস্থার জন্য হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেন।
সবশেষে, মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে এই যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়। বিশেষজ্ঞরা জানান, মাত্র ৪০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক এই যুদ্ধ সমর্থন করছেন। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক চাপের কারণে ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে, যা নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। জেমস জোগবি বলেন, সাধারণ মানুষের মতামত এবং ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক এলিটদের চিন্তাভাবনার মধ্যে এক বিশাল দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
সূত্র: দ্য নিউ আরব, তেহরান টাইমস











