বিশেষ প্রতিবেদন: 15 May 2026 , 4:29:19 89 বার পঠিতপ্রিন্ট সংস্করণ
ফিরে দেখা ‘আরব বসন্ত’: যে গণজাগরণ কাঁপিয়ে দিয়েছিল পুরো মধ্যপ্রাচ্য: ২০১০ সালের শেষভাগে শুরু হওয়া একটি স্বতঃস্ফূর্ত গণবিক্ষোভ পুরো মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার রাজনৈতিক দৃশ্যপট চিরতরে বদলে দিয়েছিল। ইতিহাসের পাতায় যা ‘আরব বসন্ত’ বা Arab Spring নামে পরিচিত। সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ কীভাবে দশকের পর দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা পরাক্রমশালী স্বৈরশাসকদের গদি উল্টে দিতে পারে, এটি ছিল তারই এক জ্বলন্ত উদাহরণ।
স্ফুলিঙ্গ থেকে দাবানল: তিউনিসিয়ায় শুরু: ঘটনার সূত্রপাত ২০১০ সালের ১৭ ডিসেম্বর, তিউনিসিয়ায়। পুলিশের দুর্নীতি, হয়রানি ও চরম বেকারত্বের প্রতিবাদে মোহাম্মদ বোয়াজিজি নামের এক তরুণ ফল বিক্রেতা নিজের গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মাহুতি দেন। এই মর্মান্তিক ঘটনা তিউনিসিয়ার সাধারণ মানুষের ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢালে। রাস্তায় নেমে আসে লাখো জনতা। শুরু হয় তীব্র গণবিক্ষোভ, যা মাত্র ২৮ দিনের মাথায় ২৩ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা স্বৈরশাসক জিনে এল আবিদিন বেন আলীর পতন নিশ্চিত করে।
এক দেশ থেকে অন্য দেশে আছড়ে পড়া ঢেউ: তিউনিসিয়ার এই অভাবনীয় সাফল্যের ঢেউ খুব দ্রুত আছড়ে পড়ে প্রতিবেশী আরব দেশগুলোতে। ২০১১ সালের শুরুর দিকে মিশর, লিবিয়া, ইয়েমেন, সিরিয়া এবং বাহরাইনের মতো দেশগুলোতেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে হাতিয়ার করে লাখ লাখ মানুষ রাজপথে নেমে আসে। তাদের দাবি ছিল অভিন্ন— দুর্নীতি ও স্বৈরশাসনের অবসান, বাক্স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা।
প্রতাপশালী স্বৈরশাসকদের পতন: আরব বসন্তের প্রবল ঝড়ে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে বেশ কয়েকটি দেশের দীর্ঘস্থায়ী স্বৈরশাসন। মিশরে তীব্র গণআন্দোলনের মুখে হোসনি মোবারকের ৩০ বছরের শাসনের অবসান হয়। লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফি ক্ষমতাচ্যুত ও বিদ্রোহীর হাতে নিহত হন। অন্যদিকে, ইয়েমেনে আলি আব্দুল্লাহ সালেহ তীব্র চাপের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন।
অর্জনের খতিয়ান: প্রত্যাশা বনাম রূঢ় বাস্তবতা: আরব বসন্ত সাধারণ মানুষের মনে যে বিশাল আশার সঞ্চার করেছিল, তা শেষ পর্যন্ত সব দেশে আলোর মুখ দেখেনি। তিউনিসিয়ায় গণতান্ত্রিক কাঠামোর কিছুটা উত্তরণ হলেও, অন্যান্য অনেক দেশের পরিণতি ছিল ভয়াবহ। সিরিয়া, লিবিয়া ও ইয়েমেন চরম রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, যার রেশ আজও কাটেনি। অন্যদিকে, মিশরে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আবারও সামরিক শাসন ফিরে আসে।
ইতিহাসের পাতায় যে ছাপ রেখে গেল: আরব বসন্ত হয়তো মধ্যপ্রাচ্যে রাতারাতি কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্র বা স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি, তবে এটি মানুষের চিন্তাধারায় বড় পরিবর্তন এনেছে। এটি বিশ্বকে প্রমাণ করে দেখিয়েছে যে, সাধারণ জনগণের সম্মিলিত শক্তির কাছে পৃথিবীর যেকোনো স্বৈরাচারী শাসকই একসময় অসহায় হতে বাধ্য। আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম যুগান্তকারী অধ্যায় হিসেবে ‘আরব বসন্ত’ তাই চিরকাল প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকবে।















