পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটি কাটিয়ে দুই দিন পর তেলের ডিপোগুলো সচল হলেও কাটছে না জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট। রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ সারা দেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে অকটেন ও পেট্রোলের জন্য হাহাকার দেখা দিয়েছে। অনেক পাম্পের সামনে ‘অকটেন ও পেট্রোল নেই’ লেখা নোটিস ঝুলতে দেখা গেছে মঙ্গলবারও। যে কয়েকটি পাম্পে তেল পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির দীর্ঘ সারি জনভোগান্তিকে চরমে নিয়ে গেছে।
মঙ্গলবার সরেজমিনে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বেশিরভাগ পেট্রোল পাম্পে তেলের সরবরাহ নেই। পাম্প কর্তৃপক্ষ বলছে, ডিপো থেকে চাহিদামতো তেল সরবরাহ না পাওয়ায় তারা বিক্রি বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। অন্যদিকে, সংকটের আশঙ্কায় সাধারণ গ্রাহকরা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছেন, যাকে কর্তৃপক্ষ ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্ক থেকে কেনা বলে অভিহিত করছে।
বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতাদের দাবি, সরকার যুদ্ধের অজুহাতে জ্বালানি সরবরাহে অঘোষিত রেশনিং করছে। সংগঠনের চট্টগ্রাম বিভাগীয় মহাসচিব আবু তৈয়ব পাটোয়ারি বলেন, "২০২৫ সালের মার্চের তুলনায় এবার ১০ শতাংশ কম তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। অথচ প্রতিবছর যানবাহনের সংখ্যা বাড়ছে। মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারের সংখ্যা বাড়লে জ্বালানির চাহিদাও বাড়ার কথা, কিন্তু দেওয়া হচ্ছে উল্টো কম।"
তিনি আরও অভিযোগ করেন, আগে ঈদের ছুটিতে অগ্রিম তেল কেনার সুযোগ থাকলেও এবার যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সেই সুবিধা দেওয়া হয়নি। ফলে পাম্পগুলোতে মজুত দ্রুত শেষ হয়ে গেছে। এছাড়া ঈদের ছুটিতে ব্যাংক বন্ধ থাকায় ‘পে-অর্ডার’ করতে না পারাও একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণনকারী তিন প্রতিষ্ঠান— পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার কর্মকর্তাদের দাবি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের মতে: পর্যাপ্ত মজুত দেশের ৫৪টি ডিপোতে অকটেন, পেট্রোল ও ডিজেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তেলের কোনো ঘাটতি নেই। সরবরাহ স্বাভাবিক নিয়ম মেনে যারা পে-অর্ডার নিয়ে আসছেন, তাদের সবাইকে চাহিদা অনুযায়ী তেল দেওয়া হচ্ছে। আতঙ্কই মূল কারণ যুদ্ধ পরিস্থিতির গুজবে চালকরা প্রতিদিনের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কিনে মজুদ করায় পাম্পগুলোতে চাপ বাড়ছে।
পদ্মা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুর রহমান রেশনিংয়ের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, "আমরা ২০২৫ সালের চাহিদাকে ভিত্তি ধরে সরবরাহ করছি। কোনো সংকট হওয়ার যৌক্তিক কারণ নেই।" মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহীরুল হাসানও একই সুরে বলেন, ডিপোগুলোতে পর্যাপ্ত তেল আছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চলমান বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আমদানিতে কিছুটা অনিশ্চয়তা থাকলেও সরকারিভাবে তা স্বীকার করা হচ্ছে না। অন্যদিকে, পাম্প মালিকদের দীর্ঘদিনের কমিশন বৃদ্ধির দাবি এবং ছুটির কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছুটা ধীরগতি—সব মিলিয়ে সাধারণ গ্রাহকরাই বলির পাঁঠা হচ্ছেন।
সরকারি ও বেসরকারি এই দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি বাড়ছে। দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে পণ্যবাহী ও গণপরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।